দেবীদ্বারে চা দোকানীর লালসায় কন্যা সন্তানের মা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কিশোরী: ঘটনা অনুসন্ধানে র‌্যাব-১১

সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবী করলেন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক যুবতী মা’। সন্তান প্রসবের ১৪দিন পারহয়ে গেলেও আদালত কিংবা থানায় কোন অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটি ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-১১’র একটি দল শনিবার দুপুরে ঘটনার অনুসন্ধানে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে যান।

 গত ১২ জুলাই শনিবার ভোরে নিজবাড়িতে জন্ম নেয় ‘আল্লাহর হাওলা’ নামে এক ফুটফুটে শিশুপুত্র। জন্ম নেয়ার পর নবজাতকের পিতৃ পরিচয়ের দাবীতে সমাজপতিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ওই পরিবার। ঘটনাটি ঘটে কুমিল্লার দেবীদ্বার পৌর এলাকার বারেরা গ্রামের কাজী বাড়িতে।

শনিবার দুপুরে র‌্যাব-১১’র কেপিএস মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনা অনুসন্ধানে এলাকা পরিদর্শন শেষে বিকেলে তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এলাকয় এসেছি। এ ঘটনায় ভিক্টিম বা ভিক্টিমের পরিবার আদালতে কিংবা থানায় কোন মামলা বা অভিযোগ করেননি। বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহীত করব। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্থানুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব। 

স্থানীয়রা জানান, নির্যাতিতার পরিবারটি খুবই দরিদ্র। তার বাবা দিনমজুর ছিলেন, প্রায় দেড় মাস পূর্বে মেয়ের এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনা শোনে হৃদক্রিয়া যন্ত্র বন্ধ হয়ে মারা যান। মা’ও অনেকটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, গত কিছুদিন পূর্বে মা’ পার্শ^বর্তী বাড়িতে কাজ করতে যেয়ে বাম হাত ভেঙ্গে যায়। অর্থাভাবে চিকিৎসা করতে পারছেনা। এক মাত্র ভাই চট্রগ্রামে একটি প্লাষ্টিক কোম্পানীতে চাকরি করেন।

 প্রায় ৪ বছর পূর্বে একই গ্রামের প্রতিবেশী এক যুবকের সাথে বিয়ে হয় ভিক্টিমের। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ার কারনে ৬ মাসও টেকিনি ওই সংসার। তার পর থেকেই তার পিতার বোঝা হয়ে পিত্রালয়ে আশ্রিত থেকে মানুষের বাড়িতে ঝি-চাকরানীর কজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।

প্রায় ৮/৯ মাস পূর্বে পাশ্ববর্তী মরহুম অধ্যাপক কাজী আবু তাহের’র বাড়ির ছাদে ওই নির্যাতিতা যুবতী ধান শুকানোর কাজ করতে গেলে ধর্ষণের শিকার হন বলে ভোক্তভূগী যুবতী জানান। ধারালো দা দেখিয়ে ওই ঘটনা কাউকে না জানাতে ধর্ষকের পক্ষ থেকে হুমকী দেয়া হয়। এক পর্যায়ে তার পরিবর্তিত শারিরীক অবস্থা লক্ষ করে বাড়ির লোকজনের চাঁপের মুখে ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়।

তবে ভিক্টিম তার প্রতিবেশী কাজী মোঃ মফিজুল ইসলামেরর পুত্র চা বিক্রেতা কাজী সোহাগের নাম বলছেন।

ঘটনা অনুসন্ধানে সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় তারা এ বিষয়ে এগিয়ে যেতে পারছেনা। একটি প্রভাবশালী চক্র ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে আদালত ও থানায় মামলা করতে কিংবা বিষয়টি সমাধানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ তুলেন স্থানীয়রা। 

 অভিযুক্ত চা বিক্রেতা কাজী সোহাগ’র পিতা কাজী মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলে এমন কাজ করতে পারেনা। মেয়েটি আমার ভাইস্তি এবং ওরা দু'জনই আমার পরিবারের। মেয়েটির পিতৃপরিচয় জানা প্রয়োজন, ডিএনএ পরীক্ষা করা হোক। যদি প্রমান হয় আমার ছেলে এর জন্য দায়ি তাহলে ওই মেয়ের দায়িত্ব আমার। 

অভিযুক্ত চা’ বিক্রেতা কাজী সোহাগ সেল ফোনে জানান, আমার সংসার আছে, আমার স্ত্রী ২ সন্তান আছে, একটি মহল ষড়যন্ত্র করে আমাকে ফাঁসাতেই এ অপপ্রচার করছেন। প্রথম দিকে মেয়েটি তার আগের স্বামী ও বারুর গ্রামের খালাতো ভাইয়ের নাম বললেও এখন ওই নামগুলো আর বলছেনা। ডিএনএ টেষ্ট করা হলেই আসল সত্যটা প্রকাশ হবে।

গ্রামের বিশিষ্ট মাতব্বর সিরাজুল ইসলাম বলেন, বেওয়ারিশ কোন সন্তানের পরিবার গ্রামে রেখে পাপ কাম করতে চাইনা। তার পিতৃপরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই ওই পরিবারটি গ্রামে থাকতে পারবে।  

ধর্ষণের শিকার সেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী যুবতী তার পুত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে এসে জানান, এই ছেলের পিতা কাজী সোহাগ। সে আমাকে জোর করে নির্যাতন করেছে। আমি আমার ছেলের ভবিষ্যত চাই। ছেলের নাম জিজ্ঞেস করলে সে জানায় এখনো নাম রাখা হয়নি। প্রতিবেশী এক চাচা জানালেন তার নাম আজ থেকে ‘আল্লাহর হাওলা’ রাখা হল। সন্তান জন্ম দেওয়ার পরই নির্যাতিতার অসহায় ও দরিদ্র পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা ধর্ষকের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। 

পুলিশ বলছে, মামলা হলে ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনগত সহায়তা দেয়া হবে। এ ঘটনাটি স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র মীমাংসার নামে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার পাঁয়তারা করছে বলেও নাম প্রকাশে একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন। ওই মহলটি ভিক্টিমকে কাজী সোহাগের নাম না বলতেও নানাভাবে চাঁপ দিচ্ছেন। 

স্থানীয় পৌর কমিশনার এমএ আউয়াল বলেন, গত ১২ জুলাই (শনিবার) ভোররাতে মেয়েটির পৈত্রিক নিবাসে একটি পুত্র সন্তন ভূমিষ্ট হয়। ঘটনার পর থেকে ওই প্রসূতী বারেরা গ্রামের প্রতিবেশী কাজী মো. মফিজুল ইসলামের ছেলে কাজী সোহাগ (২৫)’র নামই বলে আসছেন। আমরা স্থানীয়ভাবে সমাধান করার চেষ্টা করেছি, সোহাগ তার দায়ভার নিতে চায়না। আইনগত ব্যবস্থা ছাড়া এবং ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া তার সমাধান হবেনা। মেয়েটি তার নবাগত সন্তানের পিতা হিসেবে যাকে সনাক্ত করেছে, সে সত্যপ্রকাশে মেয়েটির দায়ভার নিলে আমরা এলাকাবাসীর সহযোগীতায় তাদের থাকার জন্য আলাদা একটি নির্দিষ্ট পরিমান জায়গায় আবাসাসন নির্মাণ করে দেয়ার প্রস্তাবও দিয়োছি।

এ ব্যাপারে দেবীদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি সার্বিক) মো. আরিফুর রহমান বলেন, কিশোরীর পরিবার থেকে এখনও কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

সাস্ক্রাইব করে সঙ্গে থাকুন